আসলে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন শিক্ষার্থী যখন উচ্চ মাধ্যমিক পার করে উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশ করে তখন তার হাতে পুজি হিসাবে থাকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান আর উচ্চতর গণিত পড়ার এক ঝাপি অভিজ্ঞতা। বর্তমানে অবশ্য আইসিটি বিষয়টা এ্যাড করায় শিক্ষার্থীরা আরও কিছু জানার সুযোগ পায়। কিন্তু এখানেও একটা সমস্যা আছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই শুধুমাত্র আইসিটি বিষয়টাকেই কম্পিউটার বিজ্ঞানের জন্য প্রয়োজনীয় একমাত্র সাবজেক্ট মনে করে। ফলে এখানেও তারা একটি ভুল করে বসে। আমার আজকের লেখার উদ্দেশ্য একটু ভিন্ন ধরনের। আমি আজ উল্লেখ করতে চাই, CSE সাবজেক্টটিতে আসলে কি পড়ানো হয় এবং CSE নিয়ে পড়াশোনা করে ভাল কিছু করতে চাইলে উচ্চ মাধ্যমিকের কোন কোন বিষয়ের উপর তোমার দক্ষতা থাকতে হবে।
বাংলাদেশে আন্ডারগ্রাজুয়েট লেভেলে শিক্ষার্থীদের চার বছর পড়াশোনা করতে হয়। এখানে পাবলিক এবং প্রাইভেট দুই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়েই CSE পড়ার সুযোগ রয়েছে। একটা জিনিস মনে রাখবে, তুমি CSE পড়ার জন্য যে ভার্সিটিতেই ভর্তি হও না কেন; তোমার হাতে কিন্তু প্রথমেই একটি কম্পিউটার ধরিয়ে দিয়ে সেটির বক্স খুলে যাবতীয় যন্ত্রাংশ বের করার দায়িত্ব দেয়া হবে না। মনে কর, তুমি কম্পিউটার ভালভাবে অন করতেও পারো না কিন্তু কম্পিউটারের প্রতি তোমার আগ্রহ আছে, একদিন এক বন্ধুর কম্পিউটারের সামনে বসে অল্প কিছুকশনের মধ্যেই কম্পিউটারের অনেক কিছুই শিখে নিয়েছিলা কিন্তু তোমার বাসায় কোন কম্পিউটার নেই, কম্পিউটারের গেম নিয়ে পরে থাকার পরিবর্তে নিজের পাঠ্যবইয়ের গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের সমস্যা সমাধান তোমার কাছে বেশি প্রিয়, আইসিটি বইয়ের শেষের দিকের অধ্যায়গুলো তুমি অনেক ভাল বোঝ- তাহলে কম্পিউটার সায়েন্স সাবজেক্টটি তোমার জন্যই। তোমার বন্ধু হয়ত কম্পিটার গেইমে অনেক অভিজ্ঞ কিংবা সুযোগ পেলে অন্যের ফেসবুক আইডি হ্যাকও করে দিতে পারে কিন্তু গণিত বইয়ের জটিল বিষয়গুলো তার কাছে ভাল লাগে না। তাহলে তোমার ঐ বন্ধুটি একজন গেইমার কিংবা গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসাবে নিজেকে হয়ত কিছুটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে (অবশ্যই অ্যাাডভান্সড লেভেলের ডিজাইনার হতে চাইলেও গণিতের কোন বিকল্প নেই) কিন্তু কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে নয়।
আমার লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন এবং উত্তরের দিকে আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি। আসলে, কম্পিউটার সায়েন্দের জন্য গণিত কেন এত গুরুত্বপূর্ন যে কম্পিউটার অন করতে জানার চেয়েও গাণিতিক সমস্যা সমাধানকে আমি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি? আসলে তুমি যখন কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার জন্য যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে তখন কিন্তু চার বছরের একটি বিষদ পাঠ্যসূচি বা সিলেবাস তোমার হাতে ধরিয়ে দেয়া হবে। সেই সিলেবাসের দিকে তাকালেই তুমি প্রশ্নগুলোর উত্তর পেয়ে যাবে।
প্রথম বর্ষের পাঠ্যক্রমের মধ্যেই তোমরা দেখতে পাবে Differential Calculus, Integral Calculus, Analytical Geometry এর মত কোর্স। এছাড়াও পুরো চার বছর জুড়েই তোমাকে পড়তে হবে Discrete Mathematics, Graph theory, Mathematical methods এর মত কোর্স যার সবগুলোই আসলে Mathematics এর কোর্স। এছাড়াও Heat & Thermodynamics, Optics, Modern physics, Electrical Technology সহ বেশ কিছু কোর্স থাকবে যার পুরোটাই শুধু Physics. একদম পিওর কম্পিউটার সায়েন্সের যেসব কোর্সগুলো যুক্ত থাকবে যেমন, Computer fundamentals, Introduction to Programming language কিংবা Networking theory এগুলোর একটি অধ্যায়ও কিন্তু তুমি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের বেসিক ছাড়া বুঝতে পারবে না।
এ তো গেল কম্পিউটার বিজ্ঞানের জন্য গণিতের প্রয়োজনীয়তা। এবার আসি মেধাবীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্নে। তোমার যদি গণিত নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা থাকে তাহলে তুমি কি পড়বে? গণিত না কি পকম্পিউটার বিজ্ঞান? আমি কিন্তু কখনই গণিতকে ছোট করে দেখছি না। দেখার সুযোগও নেই। কারন আমি নিজেই তো গণিতের ছাত্র। গণিত বিষয়েই স্নাতক এবং স্নাতোকোত্তর করেছি আমি। তারপরও বলছি, গণিতকে কাজে লাগিয়ে কোন প্রাকটিক্যাল সমস্যার সমাধান করা শিখতে চাইলে তুমি গণিত বিষয়ের চেয়ে কম্পিউটার সায়েন্স কিংবা অন্য যেকোন ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরে গেলে বেশি সুযোগ পাবে।
আমরা এবার আমাদের দৃষ্টিশক্তিকে আরেকটু বেশি প্রসারিত করি। যদি কোন শিক্ষার্থী অনার্স- মাস্টার্স করার পরও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ে আরও উচ্চতর পড়াশোনা করতে চায় তাহলে তার কি করতে হবে? তখন কিন্তু সে ঠিক গণিতের একটা মহাসমুদ্রে সাতার কাটা শুরু করবে। শুধু গণিত নিয়েই তার সব খেলা ধুলা শুরু হয়ে যাবে।
আজকে আমার লেখার প্রধান উদ্দেশ্য একটাই। তুমি যদি গণিতে ভাল হও তাহলে কম্পিউটারটি অন করতে না জানলেও তুমি কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবা। আর যদি গণিতে ভাল না হও তাহলে কম্পিউটারের পোকা হলেও কোন লাভ নেই। কারন কম্পিউটার বিজ্ঞানের ভাষার নামই গণিত।
আমরা যদি আরেকটু বাড়িয়ে চিন্তা করি অর্থাৎ শুধু গ্রাজুয়েশন আর পোস্ট গ্রাজুয়েশন করেই তোমার পড়াশোনা তুমি শেষ করতে চাও না বরং তুমি আরও উচ্চতর পড়াশোনা করতে চাও। তুমি চাও একজন বিজ্ঞানী হতে। আচ্ছা, তুমি যদি কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ে একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী হিসাবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে চাও তাহলে কি করতে হবে তোমাকে?
এর উত্তর দেয়ার আগে কম্পিউটার জগতে বর্তমান বিশ্বে একজন অন্যতম সফল ব্যক্তির পড়াশোনা সম্পর্কে একটু খোজ নেই। আমরা জানব মাইক্রোসফটের মালিক বিল গেটস সম্পর্কে। তোমার যে বন্ধুটি পড়াশোনা একদমই শিকেয় তুলে সারাদিন কম্পিউটারের গেম নিয়ে পড়ে থাকে সেও কিন্তু খুব ভাব নিয়ে মাঝে মাঝে বলে, "বড় হওয়ার জন্য যদি পড়াশোনা করা জরুরি হত তাহলে বিল গেটস কোনদিন বড় হতে পারত না। বিল গেটস তো একজন ফেল করা ছাত্র"। আসলে, তোমার ঐ বন্ধুটি বোকার স্বর্গে বাস করতেছে। বিল গেটস স্কুলের কিছু কিছু পরীক্ষায় ফেল করেছে বটে; কিন্তু সেই ফেলগুলো ছিল নিতান্তই খেয়ালের বশে। যেসব সাবজেক্টগুলো তাঁর ভাল লাগত না সেগুলোতে সে ইচ্ছা করে ফেল করত। বিল গেটস কিন্তু হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল এবং সেখানের গণিতের এমন একটি সমস্যার সমাধান সে বের করেছিল যার সমাধান বড় বড় প্রফেসররাও এক যুগের অধিক সময় ধরে চেষ্টা করে বের করতে পারে নি। তার মানে, বিল গেটসও গণিতে ভাল ছিল।
আচ্ছা, তুমি যদি মাস্টার্সের পরে আরও উচ্চতর প্পড়াশোনা করতে চাও তাহলে তুমি কি পড়বে? কম্পিউটার বিজ্ঞানের গবেষনার বিষয়ের কিন্তু অভাব নেই। তার মধ্যে থেকে কিছু পরিচিত টপিক আমরা একটু স্মরন করি।
ভার্চুয়াল রিয়ালিটি
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স
সিমুলেশন
মেশিন লার্নিং ইত্যাদি।
এসব বিষয় সম্পর্কে উচ্চতর পড়াশোনার সিলেবাস দেখলে তুমি চমকে উঠবে। শুধু গণিত আর গণিত। মেশিন লার্নিং নিয়ে পড়াশোনা শুরু করার আগে তোমার ক্লিয়ার ধারনা থাকতে হবে Vector & Tensor সম্পর্কে। নাহলে মেশিন লার্নিং এর কোন বইই তুমি ধরতে পারবে না। আচ্ছা, গুগল ম্যাপ আমাদের কিভাবে সঠিক লোকেশনগুলো জানিয়ে দেয়? সঠিক লোকেশনগুলো জানিয়ে দেয়ার জন্য গুগল ম্যাপসহ অন্যান্য সব ভার্চুয়াল ম্যাপগুলো যে টেকনোলজি ব্যবহার করে তার নাম জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম। এ টেকনোলজিতেও কিন্তু Solid Geometry ব্যবহার করা হয় যা গণিতপ্রেমীদের বযক্তিগত সম্পদ।


0 মন্তব্যসমূহ