
কর্মমূখী শিক্ষার প্রসার ছাড়া কোন দেশ বা জাতি উন্নতি লাভ করতে পারে না। কিন্তু আমাদের প্রচলিত ডিপ্লোমা বা পলিটেকনিক্যাল শিক্ষা কি সেই মানে পৌছতে পেরেছে যা আসলেই জাতির জন্য কল্যানকর হয়ে উঠতে পারে?? শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে আমি যতখানি আনালাইসিস করেছি তাতে আমার কাছে মোটা দাগে প্রশ্নটির উত্তর হল, “কখনই নয়”। কিন্তু কেন?? এর উত্তর অনেক। আর এর সমাধান বের করতে হলেও যেতে হবে অনেক গভীরে। আসলে, আমাদের সমাজের বেশিরভাগ লোক থিওরি আর প্রাকটিক্যালকে একটু আলাদাভাবে দেখতে আগ্রহী। তারচেয়েও বড় সমস্যা হল, আমাদের দেশের প্রতিটি লোকই বুদ্ধিজীবী। যেসব ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনায় মোটেই মনযোগী নয় কিংবা মাধ্যমিকের ফিজিক্সের প্যাসকেল আর আর্কিমিডিসের নীতি যারা কোনমতেই বুঝে উঠতে আগ্রহী নয়- সেই সব অমনযোগী ছাত্রছাত্রীদের স্থান হয় পলিটেকনিকের ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইলস কিংবা কম্পিউটার টেকনোলজিতে। ফলাফল হিসাবে যা হওয়ার তা ই হয়। চার বছর পড়াশোনা করে একজন ছাত্র ডিল্পোমা ইঞ্জিনিয়ারের পরিবর্তে একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রী, গাড়ি মেকানিক বা কম্পিউটার অপারেটর হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। কারন, অটোমোবাইল ইঞ্জিন আনালাইসিস, সেমিকন্ডাকটর কিংবা কম্পিউটার প্রোগ্রামিং লযাঙ্গুয়েজ অথবা কযালকুলাসের মত বিষয়গুলো বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাক আপ নিয়ে সে পলিটেকনিকে প্রবেশ করে না। এর কারন হিসাবে বলা যেতে পারে, মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা পলিটেকনিকে ভর্তি হয় না বলেই পলিটেকনিকের এ মৃতপ্রায় অবস্থা। কিন্তু এ কথাটিও সত্য নয়। আমাদের দেশে পলিটেকনিকে যেভাবে শিক্ষা দেয়া হয় তাতে কোন মেধাবী শিক্ষার্থীর এখানে ভর্তি হওয়ার অর্থই হল নিজের মেধাকে ধ্বংস করে ফেলা। এ বিষয়গুলোর গভীরে যাচ্ছি না আজ।
আজ আমি লিখতে চাচ্ছি, পলিটেকনিক্যাল এডুকেশন আসলে কাদের জন্য। সোজা কথায় বলতে গেলে যারা মেধার সাথে দক্ষতার সমন্ময় ঘটিয়ে একটু দ্রুত নিজেদের ক্যারিয়ারকে বিল্ড আপ করতে চায় তাদের জন্য এ শিক্ষাটা পারফেক্ট (শিক্ষার মানের উন্নয়ন অবশ্যই পূর্বশর্ত)। শুধু কাজের প্রতি নয় বরং বিজ্ঞানের প্রতি যাদের আগ্রহ আছে তারাই একজন সার্থক ডিল্পোমা ইঞ্জিনিয়ারে পরিণত হতে পারে। উদাহরন হিসাবে ইলেকট্রিক্যাল বা অটোমোবাইল ডিল্পোমার কথা ধরা যাক। পাঠ্যসূচি লক্ষ্য করলে দেখা যায় এ বিষয়গুলোতে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি এবং ম্যাথের উচ্চ মাধ্যমিক সমমানের কিছু কোর্স পড়ানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একজন ছাত্র এ কোর্সগুলোকে ‘কোনরম পার করতে পারলে বাঁচি’ মনে করে বহু কষ্টে গলধঃকরন করে এবং পরীক্ষার খাতায় উদ্গীরন করে। অথচ একজন শিক্ষার্থী যদি আসলেই মেকানিক না হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় তাহলে তার জন্য এ কোর্সগুলো অবশ্যই এসেন্সিয়াল কোর্স।
ডিল্পোমার হোল্ডারদের জন্য ‘কাজ করে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ক্যারিয়ারের উন্নতি’ করাকে খুব বেশি গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। আর এ দক্ষতা বিকাশের সময়ই ঐ সব কোর্সগুলোতে সে কি পরিমাণ ফাকি দিয়েছে তা হাড়ে হাড়ে টের পায়। যারা পলিটেকনিক্যাল সেক্টর নিয়ে কাজ করেন তারা কেন এ সহজ জিনিসটার সমাধান বের করতে পারছেন না তা আমি জানি না। ধরুন, রাস্তার উপর পরে থাকা বিকল একটি পুরানো গাড়িকে আপনার কোথাও ঠেলে নিতে হবে। এখন, আপনি যদি শত শত লোক নিয়ে গায়ের জোর দিয়ে গাড়িটাকে ঠেলতে থাকেন তাহলে হয়ত এক সময় গন্তব্যে নিতে পারবেন। কিন্তু এটা কোন স্মার্ট আইডিয়া নয়। বরং আপনার উচিত প্রথমেই ঐ বিকল গাড়ির মর্চে পরা চাকায় গ্রিজ দেয়া। এরপর সুন্দরভাবে রশি দিয়ে অন্য কোন শক্তিশালী ইঞ্জিনের গাড়ির পেছনে শক্ত রশি দিয়ে বেধে দেয়া। কিন্তু তা না করে আমাদের শিক্ষাবিদরা মর্চে ধরা পলিটেকনিক্যাল শিক্ষাকে গায়ের জোর দিয়ে ঠেলে বহু কষ্টে গন্তব্যে নিতে সক্ষম হয়।
সর্বশেষ আমি এ কথাটিই বলতে চাই, ডিপ্লোমা শিক্ষাকে বিশ্বমানের করে তুলতে হলে এর তাত্বীয় কোর্সগুলোকে অনেক বেশি গুরুত্বের সাথে পড়াতে হবে। অন্যথায় চার বছর পড়াশোনা করে এইচএসসি সমমানের সার্টিফিকেট নিয়ে ডিল্পোমা ইঞ্জিনিয়ারের পরিবর্তে বের হবে হাজার হাজার মেকানিক।
বিঃদ্রঃ আমি নিজে পলিটেকনিকে পড়াশোনা করি নি। তবে, বিভিন্ন সময়ে পলিটেকনিকের ছাত্রদের পড়াতে গিয়ে এবং সিলেবাসের পাতায় জমে থাকা কোর্সগুলো দেখে নিজের ভাবনাটুকু শুধু বিবৃত করলাম।
0 মন্তব্যসমূহ